সোনার মাটি ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ নামে পরিচিত ।পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সোনার খনি ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ নামে পরিচিত উইটওয়াটারসর্যান্ড (Witwatersrand) বেসিনকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই অঞ্চলটি শুধু সোনার জন্যই নয়, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের জন্যও বিখ্যাত।জাপানের সাদো দ্বীপটি এডো যুগে ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কারণ সেই সময়ে দ্বীপটি জাপানের মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক সোনা উৎপাদন করত। ইন্দোনেশিয়ার হারানো শহর শ্রীবিজয়া তার সম্পদ এবং সোনার ভাণ্ডারের জন্য ‘সোনার দ্বীপ’ হিসেবে বিবেচিত হত।
বিগত কিছু দিনে সোনার দামের আকস্মিক উত্থানের সাথে এই খনির প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখান থেকে প্রাপ্ত সোনা বিশ্বের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এই ‘সোনার ভূমি’র পিছনে লুকিয়ে আছে কতটা রহস্য এবং চ্যালেঞ্জ?
‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ বলতে সাধারণত দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের কাছে অবস্থিত উইটওয়াটারসর্যান্ড বেসিনকে বোঝানো হয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ সোনার খনি অঞ্চল, যা ১৮৮৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। সেই সময় একজন অস্ট্রেলিয়ান খনি শ্রমিক জর্জ হার্কোর্ট স্ট্রাটম্যান এই অঞ্চলে সোনার খোঁজ পান, যা ঐতিহাসিকভাবে ‘গোল্ড রাশ’ এর সূচনা করে। ফলে জোহানেসবার্গ শহরটি দ্রুতগতিতে বিকশিত হয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এই বেসিনের আয়তন মাত্র ৪০০ কিলোমিটার লম্বা এবং ১০০ কিলোমিটার চওড়া, কিন্তু এখান থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের মোট সোনার ৪০% এরও বেশি উত্তোলন হয়েছে।
এই খনির অনন্যতা তার ভূতাত্ত্বিক গঠনে। উইটওয়াটারসর্যান্ডের সোনা প্রধানত ‘রিফ’ নামক শিলাস্তরে পাওয়া যায়, যা ২৭০০ কোটি বছর পুরনো। এই শিলায় সোনার কণিকা কোয়ার্টজ ও অন্যান্য খনিজের সাথে মিশে থাকে। খনির গভীরতা অসাধারণ – সবচেয়ে গভীর খনি টাউ স্যান্ডটন (TauTona) ৪ কিলোমিটারেরও বেশি গভীর, যা পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর খনি। এখানে খনির কাজ করা শ্রমিকরা প্রচণ্ড গরম (৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং উচ্চ চাপ সহ্য করেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এখন রোবট এবং ড্রোন ব্যবহার হয়, কিন্তু এখনও ৮০,০০০ এর বেশি শ্রমিক এখানে কাজ করেন।
সোনা উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দশ দেশের তালিকা দেখলে ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ এর দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২০২৪ সালের হিসাব), বিশ্বের শীর্ষ ১০ সোনা উৎপাদনকারী দেশ হলো:
| দেশ | উৎপাদনের পরিমান |
| চীন | ৩৭০ টন* |
| রাশিয়া | ৩৩০ টন* |
| অস্ট্রেলিয়া | ৩১০ টন* |
| কানাডা | ২০০ টন* |
| যুক্তরাষ্ট্র | ১৭০ টন* |
| ঘানা | ১৩০ টন* |
| কাজাখস্তান | ১৩০ টন* |
| মেক্সিকো | ১২৫ টন* |
| উজবেকিস্তান | ১১৬ টন* |
| দক্ষিণ আফ্রিকা | ১০০ টন* |
* প্রায়
দক্ষিণ আফ্রিকা এখন শীর্ষে নেই, উইটওয়াটারসর্যান্ড এখনও বিশ্বের সবচেয়ে উৎপাদনশীল একক খনি অঞ্চল। এখান থেকে বছরে ১০০ টনেরও বেশি সোনা উত্তোলিত হয়, যা দেশের জিডিপির ৮% এর কাছাকাছি অবদান রাখে।
ভারতের প্রেক্ষাপটে এই খনির গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা ব্যবহারকারী দেশ, যেখানে বছরে ৮০০ টনেরও বেশি সোনা আমদানি হয়। ‘ল্যান্ড অফ গোল্ড’ থেকে আসা সোনা ভারতীয় বাজারে পৌঁছায়, বিশেষ করে জুয়েলারি এবং বিনিয়োগের জন্য। কলকাতার সোনা বাজারে এর প্রভাব সরাসরি লক্ষ্য করা যায়।
