‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ নিয়ে হইচই। স্থান রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ড। পুরমাতা পাপিয়া হালদারের অভিযোগ, তাঁকে বিয়ে করতে চান এলাকার যুবনেতা প্রতীক দে। বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হাওয়ায় প্রতীক ওয়ার্ডে কোন কাজ করতে দিচ্ছে না তাকে। এদিকে যুবনেতার বক্তব্য অন্যরকম। প্রতীকের দাবি পুরমাতার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। এক পুলিশ অফিসারের সান্নিধ্যে এসে পুরমাতা তার সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ করছে।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ এখন রাজপুর সোনারপুর পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ড। একদিকে পুরমাতা পাপিয়া হালদার ও অন্যদিকে যুবনেতা প্রতীক দে। সামাজিক মাধ্যমে করা পাপিয়া হালদারের একটি পোস্ট বেশ ভাইরাল হয়েছে। পাপিয়া দেবী ওই পোস্টে প্রতীক দের বিরুদ্ধে কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনেছেন এবং জনগণের কাছে তিনি ন্যায় বিচারের আহ্বান জানিয়েছেন।
পাপিয়া হালদারের আদি বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুরে। বাবা কলকাতা পুলিশের কর্মী তাই কাজের সূত্রে দীর্ঘ দিন ধরে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে বাড়ি করে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। পড়াশোনা পদ্মমণি গার্লস স্কুল ও তারপর বোসপুকুর কলেজে। তাঁর বক্তব্য অনুসারে কারোনাকালের পর থেকে কিছু সেবামূলক কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে পরিচিতি লাভ করেন। তারপর মমতা ব্যানার্জি ও অভিষেক ব্যানার্জির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতিতে আসা।
স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, পাপিয়া এবং প্রতীক ‘বিশেষ সম্পর্কে’ আছেন বলেই জানতেন তাঁরা। প্রতীকের হাত ধরেই সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন কলেজপড়ুয়া পাপিয়া। তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের মতে, পাপিয়ার কাউন্সিলর হওয়াটা পুরোটাই প্রতীকের অবদান। তৃণমূলের স্থানীয় কর্মীরা বলছেন, প্রতীককে দেখেই পাপিয়াকে ভোট দিয়েছেন তাঁরা।
বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখা যেত। যদিও পাপিয়ার অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে শুধু কাজের সম্পর্ক যুবনেতার। কিন্তু প্রতীক নিজে পাপিয়াকে তাঁর ‘বৌ’ বলে প্রচার করেছেন তাতে অস্বস্তিতে পড়েছেন তিনি। এমনকি, বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় দলবল নিয়ে তাঁর বাড়িতে ঢুকে তাণ্ডব করেছে প্রতীক। পাপিয়া দেবী ওই পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন একজন পুরমাতা হিসেবে মানুষের কাজ করতে গেলে কোন নেতৃত্বের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হয় কিনা?
১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের অভিযোগ বিস্তর। তাঁর দাবি, কাউন্সিলর হয়েও তাঁকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে জোর করা হচ্ছে। তিনি তাঁর ওয়ার্ডের মানুষদের জন্য কাজ করতে পারছেন না। পাপিয়ার কথায়, ‘‘আমার ওয়ার্ডের মানুষকে নাগরিক পরিষেবাটুকু দিতে পারছি না আমি। কারণ, কার্যালয়ের সামনে তালা মেরে দিয়ে বলা হচ্ছে, ‘তোমায় পরিষেবা দিতে হবে না।’ ওর (প্রতীক) ব্যক্তিগত চাহিদা ছিল। সেটা পূরণ হচ্ছে না দেখে এই বাধা।’’ পাপিয়ার কথায়, ‘‘ও সবাইকে বলে বেড়াত, আমি ওর বৌ। রেজিস্ট্রি হয়ে গিয়েছে। আমি এর প্রতিবাদ করি। আমার সঙ্গে শুধু কাজের সম্পর্ক ওর।’’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁর নাম করে টাকা তুলেছেন প্রতীক। এলাকার খাসজমি দখল করে বিক্রি থেকে শুরু করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা তোলা ও বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করা হয়েছে তাঁর নাম করে। পাপিয়ার কথায়, ‘‘২০২০ সালে করোনা পরবর্তী সময় থেকে প্রতীক এবং আরও বেশ কয়েক জন তৃণমূল নেতা অসাধু কাজে যুক্ত হন এবং আমাকে তাঁদের শিখণ্ডি হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করেন।’’
কাউন্সিলরের দাবি, মৌখিক ভাবে স্থানীয় বিধায়ক থেকে পুরপ্রধান এবং তৃণমূল নেতৃত্ব সবাইকে তিনি বিষয়টি জানিয়েছেন কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়েছে। তিনি ভয়ে-ভয়ে রয়েছেন। কাউন্সিলরের কথায়, ‘‘আমাকে বলা হচ্ছে, ওয়ার্ড ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু আমি তো কোনও দুর্নীতি করিনি। শুধুমাত্র বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জন্য কাউন্সিলর পদ ছেড়ে দিতে হবে?’’
পাপিয়া জানান, ইতিমধ্যে দাদার মাধ্যমে থানায় প্রতীকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। যেহেতু তিনি সশরীরে অভিযোগ জানাতে পারেননি, তাই এফআইআর হয়নি। থানায় জিডি হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে।
প্রতীকের জবাব, ‘‘আমি অত্যন্ত সাধারণ ভাবে জীবন যাপন করি। সাধারণ পোশাক পরি। একটা স্কুটি নিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে যাই। আমার ফোনটিও সাধারণ। আর কাউন্সিলর দামি গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ান। দামি ফোন। মিনারেল ওয়াটার ছাড়া খান না। সপ্তাহান্তে পার্টি করেন। কিন্তু ওয়ার্ডের কোনও কাজ করছেন না। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ দলীয় কর্মী এবং সমর্থকেরা।’’ তাঁর আরও অভিযোগ, কলকাতা পুলিশের এক অফিসারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে তাঁকে নিয়ে অভিযোগ তুলছেন পাপিয়া।
প্রতীক এবং পাপিয়ার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠেরা বলছেন, এ বার দুর্গাপুজোর পর থেকেই সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে তাঁদের। দেশের বাড়ি যাওয়ার নাম করে পুলিশের এক আধিকারিকের সঙ্গে নাকি সিকিমে বেড়াতে যান পাপিয়া। প্রতীকের অভিযোগ, কলকাতা পুলিশের ওই আধিকারিককে দিয়ে এলাকায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন পাপিয়া। সাধারণ বাসিন্দাদের ভয়ও দেখাচ্ছিলেন নানা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার।
