জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত Tomorrow Bio  মানুষের মৃতদেহকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় জমিয়ে রাখার মাধ্যমে ভবিষ্যতে পুনরুজ্জীবনের আশা নিয়ে কাজ করছে ও মৃত্যুর পরও জীবন ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ২০১৯ সালে ড. এমিল কেন্ডজিওরা এবং ফার্নান্ডো অ্যাজেভেডো পিনেইরো এই কোম্পানি শুরু করেন। ড. এমিল একজন ডাক্তার এবং ক্যান্সার গবেষক ছিলেন। তারা ইউরোপের প্রথম ক্রায়োনিক্স ল্যাব গড়ে তুলেছেন, যেখানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মৃতদেহকে -১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠাণ্ডা করে রাখা হয়। কোম্পানির লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি মানুষের জীবন পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি করা।

ক্রায়োপ্রিজারভেশন কি?

ক্রায়োপ্রিজারভেশন হলো একটি প্রক্রিয়া যেখানে মৃত ব্যক্তির দেহকে খুবই নিম্ন তাপমাত্রায় জমিয়ে রাখা  যাতে তার কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ভবিষ্যতে সেই দেহে  প্রাণ ফিরে আসার সুযোগ থাকে। সাধারণভাবে শরীরের জল জমে গেলে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু Cryoprotectant নামে বিশেষ এক ধরনের দ্রব্য ব্যবহারের মাধ্যমে শরীরকে এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয় যাতে বরফ না জমে । এটি শুধু একটি ফ্রিজিং নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি যার মাধ্যমে জীবনের কাঠামো অক্ষুন্ন রাখা হয়। Tomorrow Bio-এর ক্রায়োপ্রিজারভেশন প্রক্রিয়া মৃত্যু হলেই দ্রুত মেডিকেল টিম দেহ ঠাণ্ডা করার কাজ শুরু করে দেয়। শরীরের রক্ত সরিয়ে দিয়ে Cryoprotectant ইনজেকশন দেওয়া হয়, যা শরীরের জল বরফে রূপান্তরিত হওয়া থেকে বিরত রাখে। পরবর্তীতে দেহটি একটি বিশেষ Cryogenic Storage ডিভাইসে স্থানান্তরিত করা হয়। এই ডিভাইসগুলো সুইজারল্যান্ডের European Biostasis Foundation এ অবস্থিত এবং সেখানে তরল নাইট্রোজেনে শরীর দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হয়।

বিশেষ সুবিধাসমূহ ও খরচ

Tomorrow Bio সবসময় প্রস্তুত থাকে যাতে বার্লিন, আমস্টারডাম এবং জুরিখে এই চিকিৎসা পরিসেবা দ্রুত কার্যকর করা যায়। এই কোম্পানি এখন পর্যন্ত ২০ জন মানুষের পাশাপাশি ১০টি পোষা প্রাণীর দেহ ক্রায়োপ্রিজারভেশন করেছে। পুরো শরীর জমানোর খরচ প্রায় ১.৮ কোটি টাকা, আর শুধু মস্তিষ্ক জমানোর জন্য ৬৭ লাখ টাকার মত লাগে। সদস্যপদ নিয়ে গেলে খরচ কম হয় এবং মাসিক ৫৫ ডলার দিলে এই সেবা পাওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে যাতে বিদ্যুৎ সংকট বা অন্য কোন বিপর্যয়ের সময় সংরক্ষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় না।

ক্রায়োপ্রিজারভেশন প্রক্রিয়ার ধাপসমূহ

১) প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনা:

রোগী বা পরিবারের সদস্যেরা আগেই কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রিপেড সাবস্ক্রিপশন সিস্টেমের মাধ্যমে প্রস্তুতি নেন।

২) মৃত্যুর পর তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা:

মৃত্যু হলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে মেডিকেল টিম দেহের শীতলকরণ করার প্রক্রিয়া শুরু করে, যাতে কোষের ক্ষতি কম হয়। বিশেষ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও মেডিসিন দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হয়।

৩) ক্রায়োপ্রোটেকট্যান্ট প্রয়োগ:

শরীরের অর্টারিতে বিশেষ দ্রব্য প্রবাহিত করা হয়, যা শরীরের তরলগুলোকে চার্জিং থেকে রক্ষা করে।

 ৪) শরীরের ঠাণ্ডা সংরক্ষণ:

শরীরটি একটি ক্রায়োজেনিক কন্টেইনারে স্থানান্তর করা হয় যা তরল নাইট্রোজেনে ভরা থাকে।

৫) দৈর্ঘ্যকালীন সুরক্ষা:

এর পর শরীরটিকে সুইজারল্যান্ডের সংরক্ষণাগারে নিয়ে গিয়ে স্থায়ীভাবে রাখা হয়। ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং ও রক্ষণাবেক্ষণ চলতে থাকে।

ভবিষ্যতের চিকিৎসা ও পুনর্জীবনের সম্ভাবনা

বর্তমানে সম্পূর্ণ মৃতদেহকে পুনর্জীবিত করার প্রযুক্তি বিদ্যমান না হলেও, একক কোষ, শরীরের অংশ এবং প্রাণীর মস্তিষ্ক সফলভাবে ক্রায়োপ্রিজারভেশন ও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালে খরগোশের মস্তিষ্ক জমিয়ে তা পুনরায় কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে, যেখানে মেমোরি এবং সেল গঠন অক্ষত ছিল। এর ফলে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, কয়েক দশক পর উন্নত জেনেটিক্স, ন্যানোটেকনোলজি ও রিজেনারেটিভ মেডিসিনের মাধ্যমে মানুষকেও পুনর্জীবিত করা সম্ভব হবে। কিন্তু আবার অনেকেই মনে করেন, এই প্রযুক্তি এখনও পরীক্ষামূলক এবং মহাজাগতিক ধারণার মত শোনায়। বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করে বলেন, এর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল ও নৈতিক অনেক প্রশ্ন রয়ছে। পৃথিবীর নানা দেশে এই প্রক্রিয়া নিয়ে আইনগত ও ধর্মীয় বিতর্কও আছে।

Tomorrow Bio-এর বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই কোম্পানি শুধুই ইউরোপেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও ফ্লোরিডাতেও সম্প্রসারণ করেছে এবং ২০২৫ সালের মধ্যেই আরও বিস্তারের কথা করেছে। মানুষ ক্রায়োপ্রিজারভেশনকে জীবন বাঁচানোর নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে এবং অনেকেই দীর্ঘায়ু সেবা হিসেবে এর জন্য সাইন আপ করছেন। আশা করা যায় যে একদিন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মৃত্যু আর চূড়ান্ত হবে না, বরং রোগ সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যার সমাধান করে মানুষকে নতুন করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। Tomorrow Bio বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন জীবনের আশা দেখাচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *